দেশের অর্থনীতিতে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (সি এম এস এম ই) খাতের অবদান দিন দিন বাড়ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর উদ্যোক্তা, উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণে এর ভূমিকা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা বলছে, দেশের প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশ কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই)। শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে। এই খাতে প্রায় ৩ কোটি ৬ লাখের ও বেশি জনবল কর্মরত আছে।
অধিক জনসংখ্যা এবং সীমিত সম্পদের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এসএমই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত সুরক্ষার মাধ্যমে এসএমই খাতের ব্যাপকতা ও বিস্তৃতি বাড়াতে হবে।
কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির: বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে সিএমএসএমই খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান ও দেশের প্রবৃদ্ধি খাতে এ খাতের বিরাট অবদান রয়েছে। জিডিপিতে এখাতের অবদান ৩০ শতাংশ এবং মোট জনশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশের কর্মসংস্থান এ খাত থেকে আসে। নারীরদের বিরাট একটা অংশ এসএমই ‘র সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে এবং নারীদের কর্মসংস্থানের বিরাট সুযোগ সৃষ্টি করেছে এসএমই। কৃষি বহির্ভূত খাতের কর্মসংস্থানের চল্লিশ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। সম্ভাবনা বিপুল হলেও বাংলাদেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান এখনো প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যায় চীনের জিডিপিতে এসএমএস খাতের অবদান প্রায় ৬০ শ্রীলংকার বায়ান্ন জাপানে ৫৫ ভিয়েতনামে ৪৫ পাকিস্তানের ৪০ ও ভারতে ৩৭ শতাংশ। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অর্থনীতির বাস্তবতায় প্রযুক্তি নির্ভর উন্নয়নে এসএমই বিনিয়োগকে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের বিশাল যুব সমাজকে আমরা এসএমই খাতে সংযুক্ত করতে পারি। এতে দেশের কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি আরো উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। যুবকদেরকে একখাতে নিয়োজিত করতে হলে তাদেরকে সহজে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে আরো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ: অর্থনীতিতে শিল্প খাতে কাঁচামাল সরবরাহের ক্ষেত্রে এস এম ই খাত বিরাট ভূমিকা পালন করে আসছে। কৃষি থেকে শিল্পের উন্নয়নে, আমাদের পাট শিল্প, আমাদের চামড়াশিল্পসহ অধিকাংশ শিল্পের উন্নয়নে কাঁচামাল সরবরাহে এসএমই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পে গ্রামীণ জনশক্তির বিরাট অংশ এ খাতের সাথে জড়িত। এসএমই’র মাধ্যমের নতুন নতুন উদ্যোক্তার তৈরি হচ্ছে পরবর্তীতে এরা বড় ধরনের শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা ও দেশের অর্থনীতিতে আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যিক ভূমিকায় রেখে যাচ্ছে।
প্রযুক্তি নির্ভর উদ্যোক্তা তৈরি: আমাদের যুব সমাজের বিরাট একটা অংশ দিন দিন প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে তারা দেশের অর্থনীতির গতিকে তরান্বিত করার জন্য বিরাট সুযোগ সৃষ্টি করছে। ইতিমধ্যে সারাদেশে ১৭৭ টি এস এম ই ক্লাস্টার চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্লাস্টারের মাধ্যমে পণ্যের মান উন্নয়ন ডিজিটাল বিপণন, হিসাব ব্যবস্থাপনা, কর ভ্যাট, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতকরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে এস এম ই ফাউন্ডেশন এক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করা যাচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ: এসএমই উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে বহু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন সহজ শর্তে অর্থায়নের অভাব ,ব্যাংক ঋণের জামাতে সংকট, উচ্চ সুদের হার, বাজার সম্প্রসারণ এর সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি। এসব চ্যালেঞ্জ মুকাবিলা করে এসএম ই কে এগিয়ে নিতে পারলে দেশের জাতীয় অর্থনীতি এর অবদান আরো অনেকগুনে বৃদ্ধি পাবে।
কিছু পরামর্শ: পত্রিকার মাধ্যমে জানাগেলো এসএমই খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার প্রণীত জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২, জাতীয় এসএমই নীতিমালা ২০২৬ (খসড়া), ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসি ২০২৩ এবং রপ্তানি নীতিমালা ২০২৪-২০২৭-এ এসএমই খাতের জন্য বিভিন্ন কর ছাড় ও প্রণোদনার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে বাস্তবে এসব নীতিগত সুবিধা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। তাই নীতিসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর ও শুল্ক সুবিধা কার্যকরভাবে প্রদান নিশ্চিত করা জরুরি। পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় এসএমই ফাউেন্ডশন সহ ৩টি সরকারি সংস্থার মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে যে ২ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ করা হয়েছে, তা আরও বৃদ্ধি করা উচিত। এস এম ই খাতে সহজে ঋণ প্রাপ্তির ব্যবস্থা, তরুণ উদ্যোক্তাদের ও নারী উদ্যোক্তাদের উৎসহ, ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানোর ব্যবস্থা, ক্লাস্টার ভিত্তিক শিল্পের উন্নয়ন ,আন্তর্জাতিক বাজারে ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পের প্রবেশের সুযোগ তৈরি করার ব্যবস্থা করা উচিত। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় এ সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার যৌক্তিক সহযোগিতা নিলে এখাতের সুফল আরো বৃদ্ধি পাবে। ব্যাংক গুলোতে এসএমই ঋণের সূদের হার এখনো ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ। এ হার কমানো উচিত। ২০২০ সালে এক খাতে ঋণের সুদের ছিল ৯ শতাংশ। তখন একটু ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা হলে ও ২০২২ সালের ডলারের দাম বৃদ্ধি ছোট উদ্যোক্তাদের আবারো চাপের মুখে ফেলে। তখন আবার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ কমিয়ে দেয়। অথচ মোট ব্যাংক ঋণের ২৫ শতাংশ এসএমই খাতে বিতরণের নির্দেশনা রয়েছে। তবে বর্তমানে এখাতে ঋণ রয়েছে ১৮ শতাংশের কম। বাংলাদেশ ব্যাংকে নির্দেশনা মোতাবেক মোট বিতরণ কৃত ঋনের ৪০ শতাংশ শিল্প খাতে ,২৫ শতাংশ সেবায় ও ৩৫ শতাংশ ব্যবসা উপখাতে এবং ১৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ করার কথা। বিশেষজ্ঞদের মতে ভবিষ্যতে এসএমই খাত হবে প্রযুক্তি নির্ভর, উদ্ভাবনমুখী ও মানবকেন্দ্রিক। তাই এক খাতের উত্তরোত্তর সহযোগিতা ও সম্প্রসারণের জন্য সরকারকে এখন থেকে পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্যই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডিজিটাল মার্কেটিং ওই ই-কমার্সে উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে এসএমই খাতই হবে আগামী দিনের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি।