চতুর্থ কিস্তি

আমার সাংবাদিক জীবনে দেখা ১৯৭১ সালেল ১৬ ডিসেম্বরের আগে পরে আওয়ামী লীগের উইচ হান্টিং ও নৃশংসতা-নির্মমতার দিনগুলো আমি ভুলতে পাারি না। তাদের এ প্রতিহিংসার জবাবে ভারতের বিহার ও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হিজরত করে তৎকাললীন পূর্ব পাকিস্তানে আগত অবাঙালি মুসলমানদের প্রতিশোধ কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে দেখা গেছে। তাদের সহায়তা করেছে পাকিস্তান আর্মির কিছু কিছু জওয়ান। হাজারো ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্যে ছোট কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি।

দিনটি ছিল ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস। রেডিও-টেলিভিশনের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীরা পাকিস্তানী পতাকা উড়াতে দেয়নি। বলাবাহুল্য ঐ সময় পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল না; না শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে আর না মেজর জিয়ার পক্ষ থেকে। কিন্তু সারা প্রদেশব্যাপী হানাহানি, মারামারি, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ ব্যাপক বিধ্বংসী তৎপরতা চলছিল। বিভিন্ন শহরে অবাঙালি বিহারীদের ওপর নৃশংসতার মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এ অবস্থায় জানমাল ও ইজ্জত রক্ষার্থে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত বিহারীরা তাদের পরিবারের নারী ও শিশুদের ঢাকার মীরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। ২৪ মার্চ অবজার্ভার হাউজে আমার কাজ শেষে দুপুর আড়াইটার দিকে আমি রিকশাযোগে আরমানিটোলায় আমার বাসার দিকে যাচ্ছিলাম। বংশাল রোডের নিশাত সিনেমা হল অতিক্রমকালে হঠাৎ একটি প্রাইভেটকার আমার রিকশার গতিরোধ করে সামনে এসে দাঁড়ায়।

আমি ঘাবড়ে গেলাম। কিন্তু মুহূর্তেই দেখলাম গাড়ি থেকে নেমে আসলেন দৈনিক সংগ্রামের তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার জনাব এস এম হুমায়ুন। তিনি আমাকে বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে তার বাসায় আসতে অনুরোধ করলেন। তার বাসা ছিল বংশাল রোডেই, বালিয়াদী হাউজে। আমি বাসা থেকে ফ্রেস হয়ে নির্ধারিত সময়ে তার বাসায় আসলাম। আমরা খুব কাছাকাছিই থাকতাম। তিনি তৈরি ছিলেন। আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে রওনা হলাম। তিনি শুধু বললেন, একটি অবিশ্বাস্য নৃশংসতার কথা, শুনেছি, চলুন, নিজ চোখে দেখার আগে কিছুই বলবো না। আমরা হাসপাতালের ইমারজেন্সি বিভাগে যা দেখলাম, নরম দিলেন কোনো মানুষ স্থির থাকতে পারার কথা নয়। বিহারী পরিবারসমূহের নারী অর্থাৎ মা, কিশোরী, যুবতি ও শিশু সদস্যদের নিয়ে ট্রেনটি যখন নারায়ণগঞ্জ থেকে চাষাঢ়া রেলস্টেশনে পৌঁছে তখন তা থামিয়ে দিয়ে যাত্রীদের ওপর হামলা করা হয়। প্রকাশ্য দিবালোকে নারীদের শ্লীলতাহানি করা হয়, তাদের স্তন কেটে দেয়া হয় এবং যৌনাঙ্গে বেয়নেট ঢুকিয়ে নির্যাতন করা হয়। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় এই হতভাগ্যদের বৃহদাংশকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালে যাতে তাদের চিকিৎসা দেয়া না হয় সেজন্য আওয়ামী লীগ কর্মীরা ডাক্তাদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। এই অবস্থা আমাদের স্তম্ভিত করে তোলে।

দ্বিতীয় ঘটনাটি মীরপুরে, বিহারীদের প্রতিশোধ স্পৃহার অংশ হিসেবে। এটা তখন বাঙালি বিহারী রায়টে পরিণত হয়েছিল। আমার একজন সহকর্মী, কায়েদে আজম কলেজের (বর্তমান সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দি কলেজ) বাংলা বিভাগের অন্যতম শিক্ষক অধ্যাপক রফিকুদ্দিন আহমদ মীরপুরে থাকতেন। ইনি ১৯৭০ সালে নরসিংদীর রায়পুরা নির্বাচনী এলাকায় পাকস্তিান জাতীয় পরিষদে জামায়াত মনোনীত একজন সদস্য প্রার্থী ছিলেন। বিহারী দুষ্কৃতকারীরা তাকে মেরে লাশ টুকরো টুকরো করে কুয়ায় ফেলে দিয়েছিল। কুয়া সম্পর্কে আমার মনে হয় বর্তমান প্রজন্মের অনেকেরই ধারণা নেই। ঢাকা শহরে তখন বাসাবাড়িতে পানি সরবরাহের অবস্থা অত্যন্ত সীমিত ছিল। বিভিন্ন এলাকায় পাতকুয়া বা গর্ত খনন করা হতো যার গভীরতা ছিল ন্যূনতম ৩০ ফুট, রশিতে বালতি বা কলসি বেঁধে পানি তোলা হতো। রফিকুদ্দিন সাহেবের খণ্ডিত লাশ কুয়া থেকে কেউ উঠাতে সাহস করেনি, সেখানেই তার সমাধি ঘটেছে। পশুও এমন নিষ্ঠুর হতে পারে না।

তৃতীয় আরেকটি দুর্ঘটনারও আমি সাক্ষী ছিলাম। আর্মি ক্র্যাক ডাউনের পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা সেনানিবাসসমূহে রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। বলাবাহুল্য, সেনাবাহিনীর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী; বিশেষ করে চাল, ডাল, আটা-ময়দা, ভোজ্য তেল, ঘি, চিনি, দুধ, মাছ, গোশত, তরিতরকারি প্রভৃতি সরবরাহের জন্য নির্দিষ্ট ঠিকানদার/ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছিল। আওয়ামী লীগ/ ছাত্রলীগ ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বাধা সৃষ্টি করে এ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এ অবস্থায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে আর্মির ৫ জন সিপাহী তরিতরকারি, মাছ-গোশতের জন্য শাহজাহানপুর বাজারে আসে। তারা সেখানে প্রতিরোধের মুখে পড়ে।

১৫/২০ জন আওয়ামী সন্ত্রাসী তাদের ঘিরে ধরে, টাকা-পয়সা কেড়ে নেয় এবং প্রত্যেকের একটি করে কান কেটে নেয়। তারা সশস্ত্র অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও কমান্ডিং অফিসারের কাছ থেকে গুলির অনুমতি পায়নি। চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে মারাত্মক আহত অবস্থায় এক কান ফেলেই ক্যান্টমেন্টে ফিরে যায়। পাকিস্তান আর্মির atrocity-র কথা অনেকেই বলেন, কিন্তু তাদেরকে এ কাজে যারা প্ররোচিত করেছিলেন তাদের কথা খুব কম লোকই বলেন।

একটি কথা আছে Every Action has its equal and opposite reactions প্রত্যেকটি ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। একাত্তরের ঘটনা-দুর্ঘটনার এই ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার যেমনি অংশ তেমনি অংশ তেমনি একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের অখণ্ডতা রক্ষারও প্রয়াস বলে মনে করার কারণ আছে। তখনকার পত্রপত্রিকায় আমরা সাংবাদিকরা দেশ ও দেশের মানুষের বাস্তব অবস্থা তুলে ধরতে পারিনি।

আর্মি ক্র্যাকডাউনের পর পত্রিকাসমূহে কর্মরত সাংবাদিকরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। সপ্তাহ না যেতেই মেজর সালেকের নেতৃত্বে অবজার্ভার হাউজে তারা প্রেস লিয়াজোঁ অফিস স্থাপন করেন। তাদের উদ্যোগে অফিসে রক্ষিত ঠিকানার ভিত্তিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাংবাদিকদের কাজে ফিরিয়ে আনা হয়। পত্রিকাগুলোতে ছাপার জন্য তাদের পক্ষ থেকে সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় লিখে পাঠানো হতো। অবজার্ভার গ্রুপে আমরা সেগুলো চিঠিপত্র কলামে ছাপতাম। আওয়ামী লীগ ও মুক্তিবাহিনীর তৎপরতার ওপর রিপোর্ট করা যেমন নিষিদ্ধ ছিল তেমনি সামরিক কর্তৃপক্ষের কোনো কাজের বিরোধিতা বা সমালোচনা করাও নিষিদ্ধ ছিল। জামায়াত নেতা অধ্যাপক গোলাম আযম আর্মির ভালো কাজগুলোর পাশাপাশি নির্বিচারে মুক্তিবাহিনী শিকারের নামে বিভিন্ন গ্রাম ও বস্তি এলাকা জ¦ালিয়ে দেয়ারও তীব্র সমালোচনা করেন। তার এই সমালোচনার প্রেক্ষিতে অধ্যাপাক গোলাম আযমের বক্তৃতা-বিবৃতি পত্রপত্রিকায় প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা Embargo জারি করা হয়। এ এমবার্গো যাতে যথাযথভাবে পালিত হয় তার জন্য অবজার্ভার গ্রুপের পত্রিকাগুলোতে Embargo Register সংরক্ষণ করা হতো। শিপ্ট ইনচার্জরা এই রেজিস্টারে বর্ণিত নিষেধাজ্ঞার ভিত্তিতে নিউজ রিলিজ করতেন। নেজামে ইসলাম পার্টির নেতা মৌলভী ফরিদ আহমদ (কক্সবাজার) একজন নামকরা পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন। অধ্যাপক গোলাম আযম এ কাউন্সিলের একজন সদস্য ছিলেন, জামায়াতের আর কোনো নেতা এতে ছিলেন না। জেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্য; বিশেষ করে থানা ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, শিক্ষক ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে শান্তি কমিটি গঠিত হতো। বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা ও তৎকালীন নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার পিতা অলি আহাদ তার জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-১৯৭৫ শীর্ষক পুস্তকে যথার্থই বলেছেন যে, শান্তি কমিটি শুধু যে পাকিস্তান আর্মিকে মুক্তি বাহিনীর অস্ত্র ও আস্তানা সম্পর্কে তথ্য দেয়ার চেষ্টা করতেন তা নয়, তারা অসহায় সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তি এবং সম্মান রক্ষার প্রশংসনীয় কাজের সাথেও জড়িত ছিলেন।

ইতিহাসের দুঃখজনক ঘটনাবহুল ঐদিনগুলোতে আমাদের সংবাদ কর্মীদের সংবাদ সংগ্রহের প্রধান উৎস ছিল টেলি প্রিন্টারে আসা বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা; বিশেষ করে রয়টার, এএফপি, এপিপি, পিপিআই, সিনহুয়া, সোভিয়েত এজেন্সির সংবাদ বার্তা। মার্কিন সংবাদ সংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেস, স্পুটনিক রুশসংস্থা তাস এবং দূতাবাসসমূহ থেকেও আমাদের বার্তা সরবরাহ করা হতো। সব নিউজ আসতো ইংরেজিতে। বাংলা পত্রিকাসমূহে ইংরেজি থেকে তরজমা করে, নিউজগুলোকে পাঠযোগ্য ও বোধগম্য করে হেডিং দিয়ে পত্রিকায় প্রকাশ করা হতো। ১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্টং যখন নাসা-১১ যোগে প্রথম চাঁদে অবতরণ করলেন তখন পত্রপত্রিকায় সংবাদমাধ্যমগুলো প্রেরিত খবরগুলোর তরজমা নিয়ে আমাদের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে। বৈজ্ঞানিক শব্দগুলো; বিশেষ করে মহাকাশ বিজ্ঞানের কঠিন লফজগুলোর তরজমা সধারণ ডিক্সনারিতে ছিলোনা। এই পরিস্থিতিতে প্রেস ক্লাব ভবনে বাংলা একাডেমি, বাংলা উন্নয়ন বোর্ড, পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, তৎকালীন আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের (বর্তমান বুয়েট) সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহের শিক্ষক/বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে একটি তরজমা কমিটি বসানো হয়েছিল। কমিটি এই জটিল তরজমাগুলো পত্রিকাসমূহে সরবরাহ করতো।

যুদ্ধের সময় আমরা নিউজের আরেকটি গোপন সূত্র ব্যবহার করতাম, তা হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের পাক্ষিক রিপোর্ট, আইনশৃঙ্খলা, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি সংক্রান্ত এই রিপোর্টটি সংগ্রহ করা কঠিন হলেও আমরা করেছি। (অসমাপ্ত)