সংসদ রিপোর্টার
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের ২১ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়া ও চীন সফরের ‘অভূতপূর্ব সাফল্যের’ স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে একটি ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল শনিবার সকালের অধিবেশনের শুরুতে সংসদে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। পরে স্পিকার প্রস্তাবটি ভোটে দিলে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
প্রস্তাবটি ভোটে দেয়ার আগে স্পিকার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। এ সফরের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও সুদৃঢ় হবে বলে সংসদের অভিমত।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বপক্ষে এই সফর অত্যন্ত বলিষ্ঠ পদক্ষেপ ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সফরে আমাদের নিরাপত্তার প্রশ্নে বিশ্ববাসীরও দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে ১৯৭১ সালে জাতি যুদ্ধ করে দেশটিকে স্বাধীন করেছে। তারপর অনেক কঠিন সময় আমাদেরকে পার করতে হয়েছে। এমন এমন সরকার এই দেশের জনগণ দেখতে পেয়েছে যারা স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখার জন্য কোন প্রচেষ্টাই গ্রহণ করেনি।
স্পিকার বলেন, বর্তমান সংসদ নেতা এবং প্রধানমন্ত্রীর এই সাম্প্রতিক সফরের ফলে দেশবাসী অত্যন্ত আশান্বিত হয়েছেন এবং সাধারণ মানুষও এই সফরটি সাফল্যের সাথে সমাপ্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’, যা কিছু অর্জন তা দেশের মানুষের : সংসদে প্রধানমন্ত্রী
জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান দেশের স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের মানুষ তাদের স্বার্থ দেখার জন্যই সরকার ও সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব দিয়েছে।
গতকাল শনিবার সংসদে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, তাদের দল সবসময় ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘বাংলাদেশ প্রথম’ স্লোগানটি ব্যবহার করে। তিনি নিজের অবস্থান থেকে সবসময় দেশের এবং দেশের মানুষের স্বার্থ নিয়ে কথা বলার এবং তা রক্ষা করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
সংসদ নেতা বলেন, এখানে কোনো ব্যক্তিগত বিষয় বা স্বার্থ জড়িত নেই। যেকোনো ভালো অর্জন বা সফল সফরের মাধ্যমে যদি ইতিবাচক কিছু অর্জিত হয়ে থাকে, তবে তা একান্তই বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষের অর্জন।
সংসদে তার বক্তব্যের প্রতি সমর্থন ও উৎসাহ জোগানোর জন্য তিনি বিরোধীদলীয় নেতাসহ সংসদের সব সদস্যকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান। দেশের মানুষের পক্ষে কাজ করার এই যাত্রায় সবার এই ইতিবাচক মনোভাবকে তিনি আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানান।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উত্থাপিত ধন্যবাদ প্রস্তাবটিকে সমর্থন জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই দেশ আমাদের সবার। আমরা সত্যিকার অর্থেই একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি দেখতে চাই এবং তা বাস্তবায়ন করতে চাই। এক্ষেত্রে বিরোধী দল হিসেবে আমাদের যেটুকু করণীয়, সরকারকে আশ্বস্ত করছি যে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।’
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার স্বার্থে বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত সব মৌলিক চুক্তি সংসদে নিয়ে আসার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংসদকে বাইপাস (পাশ কাটিয়ে) করে যেন কিছুই না হয়, সবকিছু হোক সংসদের ভেতরে। এই সংসদ যেন সব কর্মকা-ের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়। চুক্তিগুলো সংসদে এলে জনপ্রতিনিধিরা তা জানতে পারবেন এবং এর মাধ্যমে সরকার ও জনগণের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি হবে।’
প্রধানমন্ত্রী যে দুটি দেশ সফর করেছেন, উভয় দেশকেই বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তবে দেশের বাণিজ্য ঘাটতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর দেশ। আমাদের রপ্তানির চেয়ে আমদানি অনেক বেশি। আমাদের রপ্তানির মূল দুটি জায়গা- তৈরি পোশাক (আরএমজি) ও জনশক্তি। একে বহুমুখী (ডাইভার্সিফাই) করার যথেষ্ট সুযোগ আমাদের রয়েছে। এর জন্য স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। আশা করি, প্রধানমন্ত্রী তার সফরে এই বিষয়গুলো মাথায় রেখেই দুটি দেশের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।’
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে। বাংলাদেশের স্বাধীন ফরেন পলিসিতে (পররাষ্ট্রনীতি) কেউ হস্তক্ষেপ করুক, এটা আমরা কখনো মেনে নেব না। সবার আগে দেশের স্বার্থ। কোনো চুক্তিই হোক বা যাই হোক, তা হবে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে। আমরা কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাই না, আবার নিজেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে চাই না। এই ভারসাম্য রক্ষা করেই আগামীর পলিসি যেন পরিচালিত হয়।’
রাজনীতিতে নতুন সংস্কৃতির প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এখানে সরকারি দল সব ক্রেডিট (কৃতিত্ব) নেবে আর বিরোধী দল সবকিছুতে শুধু বিরোধিতাই করবেÑ ব্যক্তিগত ও দলগতভাবে আমরা এই কালচার সমর্থন করি না। সরকারি দলকেও বিরোধী দলকে সম্মান করতে হবে। আর বিরোধী দলেরও দায়িত্ব থাকবে দেশ গঠনে তার জায়গা থেকে যথাযথ ভূমিকা রাখা।
প্রস্তাব উত্থাপন করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে গঠিত গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের এ দুই দেশ সফর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সফরের মাধ্যমে মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়েছে এবং পারস্পরিক মর্যাদা ও স্বার্থের ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
তিনি বলেন, সফরকালে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে ফলপ্রসূ বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে যাওয়া ও ফিরে আসার সময় জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনার প্রচলিত সংস্কৃতি বন্ধ করে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এ সফর বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক নীতিমালা-পারস্পরিক সম্মান, পারস্পরিক স্বার্থ, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনেরÑবাস্তব প্রতিফলন।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার, জ্বালানি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং চীনের সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নয়নের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর যে ভ্রমণ মালয়েশিয়া এবং চায়নাতেÑএই ভ্রমণটার ভিত্তি ছিল আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভিত্তি করে। আমাদের সাথে প্রত্যেকটি দেশের সম্পর্ক হবে অন মিউচুয়াল রেস্পেক্ট, অন মিউচুয়াল ইন্টারেস্ট, ওয়ান অফ নন-ইন্টারফেয়ারেন্স এবং স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি আমাদের নিজস্ব অটোনমির ভিত্তিতে। প্রধানমন্ত্রীর এই ভিজিট সেটা প্রমাণ করেছে।;
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমাদের অন্য দেশের সাথে সম্পর্কের যে বেঞ্চমার্ক, উনি সেটা আবার কনফার্ম করেছেন যেটা বিএনপির রাজনীতিতে সবসময় ছিল। যেটা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এস্টাব্লিশ করেছিলেন-প্রত্যেকটি দেশের সাথে আমাদের সম্পর্ক হবে এই মানদ-ের ওপর।
তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়াতে আমাদের শ্রম বাজারের একটা বড় ইন্টারেস্ট রয়েছে। মালয়েশিয়ার সাথে এনার্জির একটা বড় ইন্টারেস্ট রয়েছে এবং অন্যান্য ট্রেড ইন্টারেস্ট রয়েছে, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ইন্টারেস্ট রয়েছে। চায়নার সাথে আমাদের অ্যাগেইন বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নের ব্যাপারে, চায়নার সাথে বিশাল ট্রেড আমাদের সাথেÑএকচুয়ালি দে আর দ্য লার্জেস্ট ট্রেড পার্টনার অব বাংলাদেশ (Largest trade partner of Bangladesh) এবং এটাকে আরও কীভাবে বাংলাদেশের ট্রেড গ্যাপ যেটা আছে , এটা আমরা আরও কীভাবে সেখানে রপ্তানি বাড়াতে পারি সে ব্যাপারেও আলোচনা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সংস্কৃতির সূচনা করেছেন। উনি যাওয়া ও আসার সময় এয়ারপোর্টে হাজার লোক সংবর্ধনা দিতে আসেনি। এটা বাংলাদেশে একটা বিরাট কালচারাল চেঞ্জ। আগামী বাংলাদেশের রাজনীতি কেমন হবে প্রধানমন্ত্রী তার একটা স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন ।