বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী : দেশে রকমারি ফল বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত হলেও নেই সেরকম সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা। ফলে প্রতি মৌসুমেই নষ্ট হয়ে যায় অনেক প্রকার ফল। একারণে এর যথেষ্ট দামও পাচ্ছে না কৃষক-চাষিরা। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশের কৃষি অর্থনীতিও।

সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। মৌসুমি ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। গত এক দশকে দেশে ফল উৎপাদন বেড়েছে এবং চাষকৃত ফলের সংখ্যা ৫৬টি থেকে ৭৮টিতে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে কেবল আম উৎপাদনেই বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের তুলনায় ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ এখনো সীমিত। ফলে মৌসুমি ফলের বড় অংশ স্থানীয় বাজারেই বিক্রি করতে হয়। যেমন, রাজশাহী অঞ্চলে এবার আমসহ বিভিন্ন ফল রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন হয়েছে। এতে খুশি ছিলেন চাষিরা। তবে মৌসুমের শেষের দিকে এসে তা রূপ নিয়েছে হতাশায়। সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে বিপুল পরিমাণ ফল একসঙ্গে বাজারে আসায় দাম কমে গেছে। একারণে উৎপাদন বেশি হলেও প্রত্যাশিত লাভ পাচ্ছেন না কৃষকরা।

বিচিত্র ফলের সমাহার: বাজার ঘুরে দেখা যায়, এই সময়ের ফলের মধ্যে আম, লিচু, কাঁঠাল, আনারস, জাম, জামরুল প্রভৃতি অন্যতম। বাণিজ্যিকভাবে আম, লিচু, পেয়ারা, জাম, তরমুজ, লটকন, আনারস, বেল, কমলা, কলাসহ প্রায় সব ধরনের দেশি ফল ব্যাপক হারে উৎপাদিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে বিদেশি জাতের বিভিন্ন প্রকার ফল উৎপাদনও শুরু হয়েছে। এই তালিকায় আছে ড্রাগন, স্ট্রবেরি, মাল্টা, রাম্বুটান, রকমেলন ইত্যাদি। ড্রাগনসহ বাহারি সব বিদেশি ফল এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। দেশে মাল্টা ও কমলার উৎপাদনও লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলে ভালো হয় আম, লিচু, কলা, কাঁঠাল, পেয়ারা, কুল, তরমুজ, আলুবোখারা, পিচফল ইত্যাদি। মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলে ভালো হয় আম, জাম, গোলাপজাম, জামরুল, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, কুল, কলা, বেল, আনারস, হরীতকী, বহেড়া, আমলকী, তাল, খেজুর, ডেউয়া, চালতা, জলপাই, পানিফল, করমচা, কামরাঙা ইত্যাদি। উপকূলীয় অঞ্চলে ভালো হয় নারিকেল, বাতাবিলেবু, পেয়ারা, সফেদা, চালতা, কদবেল, অরবরই, আমড়া, চুকুর, ক্ষুদিজাম, তরমুজ, আমরুল, বিলাতি গাব, হরীতকী, বহেড়া, আমলকী, কেওড়া, গোলফল, তাল, পানিফল, বৈঁচি, তেঁতুল ইত্যাদি। এখন পেয়ারাও বারোমাস ধরছে। সবমিলিয়ে গত এক দশকে দেশে ফলের উৎপাদন বেড়েছে ৫০ লাখ টন।

উৎপাদন বাড়ছে: রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর জেলায় মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে ১৬ লাখ ৯২ হাজার ৬ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া চলতি মৌসুমে চার জেলায় প্রায় ৪৭টি জাতের ফল চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, এ অঞ্চলে শুধু আম নয়; লিচু, লেবু, ড্রাগন, স্ট্রবেরিসহ উচ্চমূল্যের বিভিন্ন ফলের উৎপাদনও বাড়ছে। এই চার জেলায় ১ হাজার ৭০১ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে, উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ১৫০ টন। এক হাজার ৩৮০ হেক্টর জমিতে লেবু উৎপাদন হয়েছে ১৯ হাজার ২৬১ মেট্রিক টন। এর পাশাপাশি ৪৯৫ হেক্টর জমিতে ড্রাগন ফলের উৎপাদন হয়েছে ৭ হাজার ৯৩৭ টন। ১২২ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে ড্রাগন ফল। উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ১৯৩ টন।

প্রয়োজন প্রক্রিয়াজাতের ব্যবস্থা

বাংলাদেশে ফল উৎপাদনের পর ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কৃষিপণ্য বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। এর অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার, কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাব। বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হওয়া ফলের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর জেলার বেশিরভাগ ফলচাষির অভিমত, প্রতিবছর ফল উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে তাদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হচ্ছে না। শুধু আম নয়, অন্যান্য ফলচাষিরাও একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। গোদাগাড়ীর একজন ড্রাগন চাষি বলেন, ড্রাগন ফল যদি প্রক্রিয়াজাতকরণ করা যেতো, তাহলে বাজারে ভালো দাম পাওয়া যেতো। তিনি বলেন, বাজারে একসঙ্গে বেশি ফল ওঠার কারণে দাম কমে যায়। সংরক্ষণের সুযোগ থাকলে চাষিরা ন্যায্য মূল্য পেতেন। কৃষকদের দাবি, আধুনিক হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠলে তারা ন্যায্যমূল্য পাওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখতে পারবেন। অন্যদিকে আম চাষিরা বলছেন, আম প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা থাকলে তাদের আম নষ্ট হতো না। আমগুলো প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো যেতো। এটা হলে দাম ভালো পাওয়া যেতো। রাজশাহীর কৃষি বিপণন বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, “এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো ধরনের প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নেই। তবে এ বিষয়ে একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। একটি দল পরিদর্শন করে গেছে। আশা করা যায়, আগামী দু-এক অর্থবছরের মধ্যে প্রসেসিং-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে পারে।”