ডাকসু নেতা সর্বমিত্র চাকমা জুলাই আন্দোলনের দেনা-পাওনা নিয়ে কথা বলেছেন দৈনিক সংগ্রামের সাথে। জুলাই আন্দোলনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, মূলত জুলাইয়ের যারা স্টেকহোল্ডার অংশীজন ছিলেন, যারা জুলাইকে ধারণ করতে চেয়েছে, আবার অনেকে জুলাই পরবর্তী সময়ে জুলাইযের বাপ-মা হয়ে উঠেছেন; তারা একচ্ছত্রভাবে জুলাইকে নিজের করে নিয়েছে। আমি বলবো জুলাই পরবর্তীতে জুলাইকে নিয়ে একেকজনের একেক রকমের আকাক্সক্ষা ছিল। একজন রিকশাচালকের এক রকম আকাক্সক্ষা ছিল, একজন শিক্ষার্থীর আরেক রকম আকাক্সক্ষা ছিল। আবার ব্যাংকার ও সরকারি কর্মকর্তার আকাক্সক্ষা সেরকম ছিল না। তাই বলবো জুলাইকে ধারণ করেছে যেমন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ তেমনি বিভিন্ন মনোভাবের মানুষ। ডান বাম মধ্যপন্থা থেকে শুরু করে মাজার পূজারিরাও। সঙ্গীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী থেকে শুরু করে কট্টোরপন্থীরাও। দিন শেষে আমরা দেখলাম বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় নারী নেতৃত্বে ছিলেন উমামা ফাতেমা। তিনিতো ঘোষণা দিযে রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছেন। এছাড়া সানজিদা তন্বী কিংবা নুসরাত তাবাস্সুমের মতো বলিষ্ঠ নেতৃত্ব কিন্তু এখন দেখছি না।
এবার আসি পাহাড়ের বিষয়ে। পাহাড় আর সমতলের মানুষের মধ্যে কিছু বিরূপ কথা থাকে যে পাহাড়ের মানুষ বিচ্ছিন্নতাবাদী। তারা বিপ্লব চায়। তাদের চাওয়ার মধ্যেতো কোন যু্িক্ত থাকতে পারে। সে সময় জানতে চাওয়ার কথা উঠে এসেছে। পাহাড়ি মানুষের অভিমানটা কি ? সেকথা তখন উঠে এসেছে। পাহাড় থেকে সমতল আমরা সবাই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করবো। পাহাড়িদের দুঃখকষ্ট জানার চেষ্টা করবো। ২০২৪ সালে জুলাইয়ের পর সেপ্টেম্বরেই আমরা দেখলাম একটা দাঙ্গা হলো, হামলা হলো। তাতে পাহাড়ি-বাঙ্গালি দূরত্ব আরও বেড়ে গেল। ২০২৫ সালে একইরকম আরেকটা দাঙ্গা হলো। সেই সময় আরও দূরত্ব বাড়লো। আমি বলবো পাহাড়িরা জুলাইকে ধারণ করেছিল। তারা ভোবেছিল যে জুলাইয়ের মাধ্যমে যে নতুন সময় এসেছে তাতে আমরা ভাল কিছু পাবো। কিন্তু পরে দেখলো যে ভাল কিছু পায়নি। যারা নৃত্যশিল্পী তারা ভেবেছিল ভাল কিছু পাবে। তারাও ভাল কিছু পায়নি। এভাবে আমি বলবো একেকজন একেকভাবে জুলাইকে ধারণ করতে চেয়েছে। কিন্তু সেরকমভাবে তারা পায়নি। এ কারণে স্টেকহোল্ডাররা সরে গেছে। তাই যেখান থেকে স্টেকহোল্ডাররা সরে যাবে সেটা বেহাত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তার গুরুত্বটা কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। দিনশেষে আমি বলবো মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মানুষ এখনো বিতর্ক করে। শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক করে। স্বাধীনতার ঘোষক নিয়েও বিতর্ক করে। তাই বলে মুক্তিযুদ্ধকে আপনি অস্বীকার করতে পারবেন ? পারবেন না। তেমনি জুলাইকে নিয়ে কিছু মান অভিমান থেকে যাবে। কিছু কথা থেকে যাবে বিতর্ক থেকে যাবে। জুলাই বেহাত হয়েছে কি-না সেই কথা থেকে যাবে। কিন্তু জুলাই যে হয়েছে তাতো প্রতিষ্ঠিত সত্য। অবশেষে এখানে অনেকের অনেক রকমের অভিমান থাকুক। যেমন পতিত স্বৈরাচাররা যেরকমভাবে মনে করে যে এটা একটা ষড়যন্ত্র ছিল; বাংলাদেশের মানুষ এটা মনে করে না। এটাই হলো জুলাইয়ের অর্জন। তবে বাংলাদেশের মানুষ মনে করে যে জুলাই বেহাত হয়েছে।
জুলাই থেকে আমরা কি শিক্ষা নেবো ? এমন প্রশ্নে সর্বমিত্র চাকমা বলেন, জুলাই থেকে শিক্ষা নেওয়ার মতো অনেক অনেক বিষয় আছে। আমি বলবো দিন শেষে যারা সমন্বয়ক হয়ে উঠেছিল। যেমন একাত্তর শেষ হওয়ার পর অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ এককভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্বত্বাধিকারী হয়ে উঠেছে। যার ফলে কি দেখা গেল যেই শেখ মুজিব এক সময় গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে। বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে সে স্বৈরাচার হয়ে উঠেছিল। তেমনি খুব দুঃখজনকভাবে আমরা দেখতে পাই যে, অনেক অনেক সমন্বয়ক বা ভূয়া সমন্বয়ক অনেক বেরিয়েছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে অনেক জায়গায় অনেক কিছু হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালে হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে। এগুলো হঠকারি এবং দাম্ভিকতার ফল। এই দাম্ভিকতার কারণে হয়েছে। এগুলোকে ছুঁড়ে ফেলতে হবে। একটা সময় দূর থেকে একটা বাণী শোনার জন্য আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতাম। আজ কিন্তু আমরা তাদের সে রকম মূল্যায়ন করছি না। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ধরেন শাহবাগের আন্দোলনে ছিলেন ইমরান এইচ সরকার। এখন তাদের কিন্তু কোথাও খুঁজে পান না। দিন শেষে উদাহরণ হলো জ¦লন্ত প্রদীপ এক সময় নিভে যায়। দাম্ভিকতা জিনিসটা যে-ই করুক। সেটা আসা উচিত না। আমরা এটা দেখেছি যারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সবাইকে গণতন্ত্রের পথ ধরে সংযত থাকা উচিত।
স্মৃতি কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি আসলে সম্মুখ সারির যোদ্ধা ছিলাম না। আবার আমার কমিউনিটির কোটা ছিল। এরপরও জুলাইয়ের ৭ তারিখ যখন আমাদের সমাজ বিজ্ঞানের প্রফেসর মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের আহ্বায়ক আ. খ. ম . জামাল উদ্দিন নিজেকে জাতীয় বীর হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন; সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সোস্যাল ডিভেটিং সোসাইটিরও। তিনি মোশাররফ ভাইকে তার সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। তখন আন্দোলনটা তেমনভাবে শুরুই হয়নি। জাস্ট বাংলা ব্লকেড গিয়েছিল ৬ জুলাই। সেই ৭ জুলাই আমি আমার নিজের কোটা আছে তা জানা সত্ত্বেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে হবে এজন্য কেন তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো কেন ? এজন্য আমি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম। আমি তখন মোস্ট জুনিয়র ডিবেটিং সোসাইটিতে। আমি তখন লিখলাম ‘আমি সর্বমিত্র চাকমা, ডিবেটিং সোসাইটির সাধারণ সম্পাদককে সরিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে আমি আমার পদ থেকে ইস্তোফা দিলাম। সেই প্রতিবাদ থেকে আমার আন্দোলনে যাত্রা শুরু। এই যে সাহসটা দেখিয়েছিলাম। তবে এটাকে আমি গর্ব করে বলি না। আমার কোটা থাকার পরও ৯ এবং ১০ তারিখে আন্দোলনে যোগ দিয়েছি। সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিয়েছি। কারণ আমি কিন্তু ছবি তুলতে খুব পছন্দ করি। আন্দোলনের ছবি সোস্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়লে আমার প্রতি বেশ হুমকি আসে। সেই হুমকিটা দেয় আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। তিনি জগন্নাথ হলে থাকতেন। বাধ্য হয়ে আমি আমার পোস্ট এবং ছবিগুলো ডিলেট করি। ৫ আগস্ট অবশ্য ঢাকায় ছিলাম না। এর কারণ তখন ঢাকায় ব্যাপক তল্লাশি চলছিল। মানুষকে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি থাকতাম ইন্দিরা রোডে। ১ আগস্ট পাশের রোডে যখন তল্লাশি চললো তখন আমি আর আমার ভাই দুজন মিলে রাঙামাটিতে চলে যাই। রাঙ্গামাটিতে তেমন কোন আন্দোলন হয়নি। তবে দেখলাম দিন শেষে সেখানে ভূয়া সমন্বয়ক বেরিয়েছে।