মোঃ কায়সার হামিদ (জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাবেক ফুটবলার) : ১২ জুন থেকে মাঠে গড়ানো ফিফা বিশ্বকাপে শোনা যাচ্ছে বিদায়ের সুর। ৪৮ দল নিয়ে শুরু হওয়া বিশ্বকাপে টিকে আছে মাত্র চারটি দেশ। ১৫ জুলাই ফ্রান্স বনাম স্পেন আর ১৬ জুলাই আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডে মধ্যকার দুটি সেমিফাইনালের বিজয়ীরা ২০ জুলাই নিউ জার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়ামে ফুটবলের বিশ্বজয়ের লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে। এদিনই পর্দা নামবে ২৩তম বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের। ২০২৬ বিশ্বকাপে নতুন কোন চ্যাম্পিয়নের দেখা মিলছে না। সেমিফাইনালের চার দলের রয়েছে বিশ্বকাপ জয়ের পূর্ব-অভিজ্ঞতা। ১৯৯৮ আর ২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স মুখোমুখি হবে ২০১০ সালের বিশ্বকাপজয়ী স্পেনের। ১৯৬৬ সালের চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ১৯৭৮, ১৯৮৬ আর ২০২২ সালের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। শুধু দলের ক্ষেত্রে নয় , চলতি বিশ্বকাপ দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়দের প্রতি উদারতা। টুর্নামেন্টে সর্বাধিক ৮টি করে গোল করেছেন লিওনেল মেসি আর কিলিয়ান এমবাপ্পে। ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন আর জুড বেলিংহ্যাম করেছেন ৬টি করে গোল।

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর ফরোয়ার্ড আর্লিং হালান্ডের দল কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিলেও নিজে করেছেন ৭টি গোল। ব্যালন ডি’অর বিজয়ী উসমান দেম্বেলে ১টি হ্যাট্রিকসহ পাঁচ গোল করে ফ্রান্সের সেমিফাইনাল পর্যন্ত যাত্রায় রেখেছেন বড় ভূমিকা। আবার ৪২ বছর বয়সি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকেও পুরো ব্যর্থ বলা যাবে না। হ্যাঁ , তার দল কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু রোনালদো আসরে তিন গোল করেছেন। রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলা পর্তুগীজ মহাতারকা ক্যারিয়ারে প্রথম বিশ্বকাপ নকআউটে গোল পেয়েছেন। নকআউট পর্ব পর্যন্ত দুর্দান্ত খেলা ভিনিসিয়ুস চার গোল আর তিনটি ‘ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ’ পুরস্কার পেয়েছেন। রোনালদো পেয়েছেন দুটি ম্যাচে। তাদের পুরো ব্যর্থ বলি কিভাবে! হ্যাঁ , তাদের দল শিরোপা জিততে পারেনি , সেই ব্যর্থতা তাদের পোড়াবে। জার্মানির নকআউটের শুরুতে বিদায় অবাক করে নি। তারা বিশ্বকাপের ফেভারিট ছিল না।

চলতি বিশ্বকাপে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশী ২৯২টি গোল হয়েছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে গড়া সর্বোচ্চ ১৭২ গোলের রেকর্ড গুঁড়িয়ে গেছে। বিশ্বকাপের নির্দিষ্ট কোন আসরে প্রথম গোলের ডাবল সেঞ্চুরি হয়েছে । ট্রিপল সেঞ্চুরিও হয়ে যেতে পারে । কারণ এখনও ৪টি ম্যাচ বাকী। জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার (১৬) রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২১ গোলের মালিক হয়েছেন মেসি। ২০ গোল করে তার পিছু ধাওয়া করছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। সেমির আগ পর্যন্ত বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশী ৩২টি ম্যাচ খেলে ফেলেছেন মেসি। গ্রুপ পর্বে সবচেয়ে ১৪টি গোল আর সব মিলিয়ে সবচেয়ে বেশী ২২টি ম্যাচ জয়ের রেকর্ড মেসির নামের পাশে । আবার নকআউট পর্যায়ে সবচেয়ে বেশী ১২টি গোলের মালিক এমবাপ্পে। টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ড গড়েছেন রোনালদো। ছয়টি করে বিশ্বকাপ খেলেছেন রোনালদো , মেসি আর গুলেরমো ওচোয়া। সব রেকর্ড চলতি বিশ্বকাপেই হয়েছে।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপেই শেষবারের মতো দেখা গেলো নেইমার, রোনালদো , মেসি , এনগোলো কন্তে , মোহাম্মদ সালাহ, কেভিন ডি ব্রুইন ম্যানুয়াল ন্যুইয়ার আর লুকা মদ্রিচদের মতো মহাতারকাদের। বলা যায়, ফুটবলের একটি সোনালি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো। ফুটবল ইতিহাস এই মহাতারকাদের মনে রাখবে আজীবন। নেইমারের জন্য দুঃখবোধ থেকে যাবে। ফুটবলের নিপুণ শিল্পী হয়েও ফুটবল থেকে কিছুই পেলেন না তিনি । ব্যালন ডি’অরের মতো ব্যক্তিগত স্বীকৃতি কিংবা দলীয় বড় কোন ট্রফি । তার জেতা ফিফা কনফেডারেশন্স কাপ কিংবা অলিম্পিক স্বর্ণ ফুটবলের ‘মেজর ট্রফি’ হিসেবে স্বীকৃত নয়। ইনজুরির সাথে খামখেয়ালী জীবনের মূল্য চুকিয়েছেন তিনি । আবার , সর্বকালের সেরাদের একজন হয়েও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরতে না পারা ভক্তদের কাঁদাবে বাকী জীবন।

এশিয়া মহাদেশের কাতার, ইরান, ইরাক, জর্ডান, উজবেকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সৌদি আরব গ্রুপের বাধা পেরুতে পারেনি। জাপান নকআউট পর্বে দুর্দান্ত লড়াই করে ব্রাজিলের কাছে হেরেছে। অস্ট্রেলিয়া টাইব্রেকারে হেরে যায় মিশরের কাছে। আফ্রিকার কেপ ভার্দে চমকে দিয়েছে নকআউটে উঠে। লিওনেল মেসিদের আর্জেন্টিনার সাথে ১২০ মিনিটের দুঃসাহসী লড়াইয়ে হেরেছে ২-৩ গোলে। গ্রুপের লড়াইয়ে মাত্র সাড়ে পাঁচ লক্ষ্য জনসংখ্যার দেশটি রুখে দেয় দুই সাবেক চ্যাম্পিয়ন স্পেন আর উরুগুয়েকে। টুর্নামেন্টের চার ম্যাচে দুর্দান্ত খেলা উপহার দিয়ে কেপ ভার্দের কিপার ভোজিনহা কেড়ে নিয়েছেন কোটি ফুটবলভক্তের হৃদয়।

প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে একই সাথে বিদায় নেয় তিন স্বাগতিক মেক্সিকো , কানাডা আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আফ্রিকার দেশগুলোর মরক্কো কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত যেতে পেরেছে। তবে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে গেলেও মিশর পেয়েছে সবার সমবেদনা। দুই গোলে এগিয়ে গিয়েও মিশরের আর্জেন্টিনার কাছে হেরে যাওয়া ম্যাচে রেফারির অবদান রয়েছে- এই বিতর্কে ফুটবলবিশ্ব বিভক্ত।

ব্রাজিলের প্রসংগ দিয়ে শেষ করি। নরওয়ের কাছে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে সেলেসাওদের হার দুর্ভাগ্যের । ম্যাচে গোলরক্ষককে একা পেয়েও গোল করতে পারে নি এন্ড্রিক। পেনাল্টি মিস করেছে ব্রুনো গুইমারেস। এই পেনাল্টি শট নেয়া উচিত ছিল ভিনির। তিনিই ছিলেন আসরে ব্রাজিলের সেরা খেলোয়াড় । এন্ড্রিক আর ব্রুনো গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে ম্যাচে ফেরার কোন সুযোগ নরওয়ে পেতো কিনা সন্দেহ। আসলে শুধু ভালো খেলেই ট্রফি জয় করা যায় না , লাগে ভাগ্যের ছোঁয়া । সেই ভাগ্য ২০০২ সালের পর থেকে ব্রাজিলের প্রতি রুষ্ট। আগামীদিন বিশ্বকাপে নজরকাড়া উঠতি খেলোয়াড়দের আর গোল্ডেন-বল এবং গোল্ডেন বুটের দাবিদারদের নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছে আছে। সেই প্রত্যাশা রেখে বিদায় নিলাম।