যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান প্রাইমারি রান-অফ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনার পর ইসলামবিদ্বেষ ও মুসলিমবিরোধী আচরণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় মুসলিমরা বলছেন, তারা এখন আগের তুলনায় বেশি ঘৃণা, বৈষম্য এবং মৌখিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

টেক্সাসের বাসিন্দাদের ভাষ্য, কিছু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য সাধারণ মানুষের আচরণেও প্রভাব ফেলছে। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পার্ক, শপিং সেন্টার থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন জায়গায় মুসলিমদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে।

সম্প্রতি হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে নামাজরত মুসলিম শিক্ষার্থীদের সামনে এক ব্যক্তি পবিত্র কোরআন পুড়িয়ে দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া ধর্মীয় বা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরার কারণে অনেক মুসলিম মৌখিকভাবে অপমান ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।

ডালাসের বাসিন্দা এবং ইসলামিক সেন্টার অব নর্থ আমেরিকা কাউন্সিল ফর সোশ্যাল জাস্টিসের সদস্য নায়লা সৈয়দ বলেন, ইসলামবিদ্বেষ এখন সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রভাব সাধারণ মানুষের আচরণে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।

তিনি জানান, তাঁর দুই মেয়েও স্কুলে ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্য ও প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। সহপাঠীরা তাদের জিজ্ঞাসা করেছে, তারা জানে কি না যে ইসলামে নারীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়। একজন অভিভাবক হিসেবে এ ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

স্থানীয় মুসলিম নেতারা বলছেন, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। তাদের মতে, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে ঘৃণাপ্রসূত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

অনলাইন হ্যারাসমেন্ট ও হুমকির কারণে অনেকে ছদ্মনাম ব্যবহারের অনুরোধ করেছেন। সম্প্রতি টেক্সাস জিপির অফিশিয়াল কনভেনশনে অংশ নেওয়া কয়েকজন মুসলিম প্রতিনিধিকে বলা হয়, হয় তারা খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হোক, নয়তো দেশ ছাড়ুক। একই সময়ে মুদি দোকানে দুই মুসলিম নারীকে লাঞ্ছিত করার একটি ভিডিও সামনে আসে। সেখানে এক নারী বলেন, ‘ইসলাম কোনো ধর্ম নয়, এটি সন্ত্রাসী সংগঠন। এটি মুসলিমদের দেশ নয়, এটি খ্রিস্টানদের দেশ।’

ওই নারীর জন্য অনলাইনে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার ডলার তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে এবং রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ন্যান্সি মেস এতে সমর্থন দিয়েছেন। ন্যান্সি মেস এবং ব্র্যান্ডন গিল মুসলিমপ্রধান দেশগুলো থেকে অভিবাসনের বিরোধিতা করছেন।

টেক্সাসের ২৬তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধি ব্র্যান্ডন গিল তার ভোটারদের পাঠানো এক ইমেইলে লিখেছেন, ‘এখনই ইসলামিক অভিবাসন বন্ধ করুন, অন্যথায় আমাদের সন্তানদের মাশুল দিতে হবে।’

ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এটি বন্ধ না হলে তার মেয়েসহ অন্য মেয়েদের বোরকা পরে সরকারি স্কুলে যেতে হবে।

জিপির অফিশিয়াল প্ল্যাটফর্মে বিদ্বেষ

জুন মাসে অনুষ্ঠিত টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টির কনভেনশনে আইনগত অগ্রাধিকারের তালিকায় ‘ডোন্ট শরিয়াহ আওয়ার টেক্সাস বা আমাদের টেক্সাসে শরিয়াহ নয়’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে মূলত শরিয়াহ আইনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, টেক্সাসে কেউ শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে না। শরিয়াহ কেবল আইন নয়, এটি একটি নৈতিক আচরণবিধি যা কোরআন থেকে নেওয়া হয়েছে।

কনভেনশনে অংশ নেওয়া ওমর (ছদ্মনাম) জানান, সেখানে মুসলিমদের বারবার সন্ত্রাসী বলা হয়েছে এবং দেশ ছাড়তে বলা হয়েছে।

ওমর বলেন, ‘আমরা সাধারণ আমেরিকানদের মতোই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবি। আমরা পরিবারের মানুষ। এটি আমার বিশ্বাস করা আমেরিকা নয়, তবে আমি কোথাও যাচ্ছি না।’

স্টেট কম্পট্রোলার পদের গ্রিন পার্টির প্রার্থী শেহলা ফায়জি এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রিপাবলিকানদের সমর্থন করা মুসলিমদের সঙ্গে এমনটা ঘটা কেবল সময়ের ব্যাপার ছিল।

মূল দলগুলো ঘৃণার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান না নেওয়ায় তিনি স্বতন্ত্র দল থেকে নির্বাচন করছেন। টেক্সাসে মাত্র দু’জন মুসলিম আইনপ্রণেতা আছেন।

ফায়জি মনে করেন, এই বর্ণবাদ মুসলিমদের মানসিকভাবে সংকুচিত করে ফেলে।

অস্টিনে স্টেট বোর্ড অব এডুকেশনের এক শুনানিতে নায়লা সৈয়দ দেখতে পান, সামাজিক শিক্ষা সিলেবাস সংশোধনের আলোচনায় অন্তত ছয়জন বক্তা মুসলিম সভ্যতা ও বিশ্ব ইতিহাসে ইসলামের ভূমিকা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা কোরআনের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন এবং অন্যরা তাতে হাততালি দিচ্ছিলেন।

এই মিটিংয়ের পর রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা বোর্ড সামাজিক শিক্ষার নতুন খসড়া অনুমোদন করে, যেখানে দাসত্ব ও নাগরিক অধিকারের পাঠ সংকুচিত করা হয়েছে। নায়লা সৈয়দ মনে করেন, এটি প্রথমে একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে দানব বানানোর মাধ্যমে শুরু হয় এবং পরে অন্য গোষ্ঠীর দিকে মোড় নেয়।

নায়লা সৈয়দ কংগ্রেসের ‘শরিয়াহ-মুক্ত আমেরিকা’ ককাসের প্রতিষ্ঠাতা কিথ সেলফের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলেও সফল হননি। টেক্সাসের অন্যতম মুসলিম আইনপ্রণেতা ড. সুলেমান লালানি রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করতে একটি ‘ইন্টারফেইথ ককাস’ গঠন করেছেন। তিনি হিউস্টনে ‘ধর্মের রাজনৈতিকীকরণ’ নিয়ে একটি প্যানেল আলোচনা সভার আয়োজন করেন।

সেখানে ড. সুলেমান বলেন, ‘অজ্ঞতা থেকে ভয়ের জন্ম হয় এবং ভয় থেকে ঘৃণা আসে। আমরা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হলে সচেতনতা বাড়বে।’

দক্ষিণ-পূর্ব টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ ক্রিশ্চিয়ান ম্যানুয়েল সরাসরি বলেন, ‘আমাদের সবাইকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা মানুষের অজ্ঞতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান