"গণভিত্তি শক্তিশালী করে শ্রমিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে" বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামী সেক্রেটারি জেনারেল ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের দুই দিনব্যাপী ‘লিডারশিপ ট্রেনিং ক্যাম্প-২০২৬’-এর প্রথম দিন শনিবার (২৭ জুন) রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, আল্লাহর গোলামি করা, তাঁকে রব ও ইলাহ হিসেবে মেনে তাঁর বিধান সমাজে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। যে কাজে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হন, সেই দ্বীনের আন্দোলনে শামিল হওয়ার তাওফিক লাভের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিত।
প্রত্যাশিত শ্রমিক নেতৃত্বের গুণাবলি তুলে ধরে তিনি বলেন, একজন শ্রমিক নেতা শুধু নেতৃত্ব দেবেন না, শ্রমিকদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকবেন। কোনো শ্রমিক অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকার প্রয়োজন হয় না; আন্তরিক ভালোবাসাই একজন শ্রমিককে আপন করে নিতে পারে। তিনি শ্রমিকদের মধ্যে গণভিত্তি তৈরির আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইমাম সমিতি, সাংবাদিক সমাজ, প্রেসক্লাব, দোকান সমিতিসহ সমাজের প্রতিটি স্তর, পাড়া ও মহল্লায় জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে এবং জননেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একজন শ্রমিক নেতার চালচলন, আচার-আচরণ ও ব্যক্তিত্বে পরিপূর্ণতা থাকতে হবে। পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি ব্যক্তিত্ব শ্রমিকদের আকৃষ্ট করে। একজন ছাত্রকে যেভাবে বুকে টেনে নেওয়া হয়, তেমনি একজন শ্রমিককেও আন্তরিকতার সঙ্গে আপন করে নিতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি আচরণে বৈষম্য পরিহার করতে হবে, অন্যথায় আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তিনি শ্রমিকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য শ্রম মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার এবং আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে সমাজে নেতৃত্বের ধারা সৃষ্টি করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের প্রধান বিরোধী দলের শ্রমিক সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন প্রকৃত অর্থেই শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করতে চায়। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংগঠনের ছোট-বড় সব কার্যক্রম মাল্টিমিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমানে যার হাতে একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন রয়েছে, সেও প্রচারের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রচারের দিক থেকে সংগঠনকে আরও এগিয়ে যেতে হবে। তিনি সংগঠনের মাল্টিমিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত কার্যক্রম শেয়ার করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, একটি শেয়ার বা পোস্টও শ্রমিক কল্যাণের কার্যক্রম ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সংগঠনের মিডিয়া উইং এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সংবাদসহ সব কার্যক্রম নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ের যেকোনো কর্মসূচির তথ্য মিডিয়া উইংয়ে পাঠালে কেন্দ্রীয়ভাবে তা সাজিয়ে দেশব্যাপী প্রচার করা হবে। এতে সংশ্লিষ্ট এলাকার সাংগঠনিক কার্যক্রম ও শক্তিমত্তা সারা দেশে তুলে ধরা সম্ভব হবে। সবার সহযোগিতায় একটি শক্তিশালী ও কার্যকর মিডিয়া উইং গড়ে তোলার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লস্কর মো. তসলিম এর সঞ্চালনায় আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খাঁন, সহ-সভাপতি গোলাম রব্বানী, কবির আহমেদ, মুজিবুর রহমান ভূঁইয়া, সহ-সাধারন সম্পাদক এডভোকেট আলমগীর হোসেন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি আব্দুস সালাম, উত্তরের সভাপতি মাওলানা মহিবুল্লাহ, বাংলাদেশ রেলওয়ে এমপ্লয়িজ লীগের সভাপতি আখতারুজ্জামানসহ কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন জেলা এবং মহানগরের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খাঁন তার অতীত স্মৃতি উপস্থাপন করেন দৃঢ়তার সাথে শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার আহবান জানান।
কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি গোলাম রাব্বানী বলেন, “সাড়ে সাত কোটি শ্রমিককে বাদ দিয়ে কখনো ইসলামী বিপ্লব সম্ভব নয়। আজ হোক, কাল হোক—বাংলাদেশে ইসলামী শ্রমনীতি চালু করবই, ইনশাআল্লাহ।”
কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ পরিবহন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি কবির আহমেদ ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, দেশের প্রতিটি সেক্টরে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন জোরদার করতে হবে।
কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ স্থলবন্দর শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুজিবুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কার্যালয়ে সংগঠনের নিজস্ব সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি মহাসড়কের দুই পাশে “শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর পূর্বে তাদের মজুরি পরিশোধ করো” এবং “শ্রমিকেরা আল্লাহর বন্ধু”—এ ধরনের হাদিসসম্বলিত সাইনবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ফেডারেশনের আহ্বানে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন জেলা ও মহানগরের দায়িত্বশীল নেতারা পারিবারিক ব্যস্ততা উপেক্ষা করে এই প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অংশ নিয়েছেন। যেসব জেলা ও মহানগরে সাংগঠনিক কাজের ঘাটতি রয়েছে, তা দ্রুত পূরণে সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে।
প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে বক্তারা সংগঠনের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি, শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, দক্ষ নেতৃত্ব তৈরি এবং আধুনিক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে সংগঠনের কার্যক্রমকে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।