নাটোরের নলডাঙ্গা পৌরসভার ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ১০২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ২৩৫ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে।

সোমবার (২৯ জুন) দুপুরে নলডাঙ্গা পৌরসভার আয়োজনে পৌরসভার অস্থায়ী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত বাজেট অধিবেশনে এ বাজেট উপস্থাপন করা হয়।

উন্নয়ন, নাগরিক সেবা, অবকাঠামো ও জনস্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রণীত এ বাজেটকে ঘিরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নলডাঙ্গা পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আশিকুর রহমান। তিনি পৌরসভা বাজেট (প্রণয়ন ও অনুমোদন) বিধিমালা, ১৯৯৯ অনুযায়ী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন ও পাঠ করেন। বাজেট উপস্থাপনকালে তিনি বলেন, পৌরবাসীর জীবনমান উন্নয়ন, সেবার পরিধি বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত ঘাটতি পূরণে এ বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “একটি বাস্তবসম্মত ও অংশগ্রহণমূলক বাজেট প্রণয়নের মাধ্যমে পৌরসভার উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা আমাদের লক্ষ্য।”

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরোজ মুজিব। তিনি বাজেটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, রাজস্ব আয় ও উন্নয়ন আয়—উভয় খাতেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে পৌরসভার চলমান প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। তিনি জানান, বাজেট প্রণয়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল এমরান খাঁন। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। “নলডাঙ্গা পৌরসভার এই বাজেট বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী। উন্নয়ন খাতে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা পৌরবাসীর প্রত্যাশা পূরণে সহায়ক হবে,” বলেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বাজেট বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জুনায়েদ আহম্মেদ, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সুমন সরকার, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সানাউল্লাহ, উপজেলা প্রকৌশলী হারুনার রশিদ, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম, নলডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরে আলম, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, সুধীজন এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা।

উপস্থাপিত বাজেট অনুযায়ী, রাজস্ব খাতে প্রস্তাবিত আয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৮২ লাখ ১৮ হাজার ৭২৩ টাকা এবং উন্নয়ন খাতে (প্রকল্পসহ) আয় ধরা হয়েছে ৯৯ কোটি ৪৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫১২ টাকা। ফলে মোট প্রস্তাবিত আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ২৩৫ টাকা। বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, উন্নয়ন খাতেই সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, রাজস্ব খাতে ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে ২ কোটি ৮৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা এবং উন্নয়ন খাতে (প্রকল্পসহ) ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৯ কোটি ৩৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫১২ টাকা। এতে মোট প্রস্তাবিত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০২ কোটি ২০ লাখ ৩১ হাজার ৫১২ টাকা। ব্যয়ের খাতগুলোতে পৌরসভার দৈনন্দিন কার্যক্রম, উন্নয়ন প্রকল্প, সেবা সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামোগত কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে বাজেট অধিবেশনে জানানো হয়।

প্রস্তাবিত বাজেটে সর্বমোট ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৩ টাকা উদ্বৃত্ত দেখানো হয়েছে, যা পৌরসভার আর্থিক ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বক্তারা বলেন, সীমিত সম্পদের মধ্যেও উদ্বৃত্ত বাজেট প্রণয়ন পৌর প্রশাসনের পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন।

এ সময় প্রশাসক মো. আশিকুর রহমান বলেন, “উদ্বৃত্ত বাজেট শুধু আর্থিক সক্ষমতার পরিচয় নয়, বরং এটি সঠিক পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার ফল।” বাজেট অধিবেশনে পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়ন, নাগরিক সেবা সম্প্রসারণ, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সড়ক উন্নয়ন, আলোকসজ্জা, জনস্বাস্থ্য এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নে গুরুত্বারোপ করা হয়।

বক্তারা জানান, পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সড়ক, ড্রেন, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আলোকায়ন ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে নাগরিক ভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসবে। একই সঙ্গে পৌরবাসীর অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে উন্মুক্ত বাজেট আয়োজনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা নলডাঙ্গা পৌরসভার সার্বিক উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে সকলের সম্মিলিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল এমরান খান বলেন, “পৌরসভার উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও নাগরিকদের সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য।” তিনি আরও বলেন, বাজেটে ঘোষিত প্রতিটি খাত যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে পৌরসভার চেহারায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।

এ সময় স্থানীয় পৌরবাসীও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক বিষয়ে মতামত ও পরামর্শ প্রদান করেন। কেউ ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কেউ সড়ক সংস্কার, আবার কেউ পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদারের দাবি জানান। উপস্থিত কর্মকর্তারা এসব মতামত গুরুত্বের সঙ্গে শোনেন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তা বিবেচনায় নেওয়ার আশ্বাস দেন। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, ঘোষিত বাজেট সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে নলডাঙ্গা পৌরসভা আরও আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও নাগরিকবান্ধব পৌরসভায় পরিণত হবে।