সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বা আস্থাহীনদের বদলে বিশ্বস্তদের বসানোর কৌশল নেওয়া হচ্ছে

রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে আরও বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বা আস্থাহীন বিবেচিত ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়ে সংবেদনশীল পদে বিশ্বস্তদের বসানোর কৌশল নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এমন তথ্য মিলেছে।

সূত্র জানায়, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর নানা অভিযোগে ইতোমধ্যে ৬৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর আওয়ামী ঘনিষ্ঠতা এবং নানা নেতিবাচক কর্মকান্ডের অভিযোগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে আরও অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে। একইভাবে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনের ৯ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও সরকারের ১৩ জন সচিব, ২২ জন জেলা প্রশাসক ও চুক্তিভিত্তিক ১০১ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।

সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, আওয়ামী ঘনিষ্ঠদের ওপর কড়া নজর থাকলেও এ বিষয়ে এখনই তাড়াহুড়ো করে কোনো পদক্ষেপ নিতে চায় না সরকার। সংশ্লিষ্টরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, সঠিক বিচার-বিশ্লেষণ এবং সতর্ক বিবেচনার মাধ্যমেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ।

জানা গেছে, সরকারের পর্যালোচনায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে বিবেচিত হওয়ায় সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনকে সরে দাঁড়ানোর জন্য বার্তা দেওয়া হলে শুক্রবার তিনি পদত্যাগ করেন। যদিও পদত্যাগ পত্রে সাহাবুদ্দিন অসুস্থতার কারন হিসেবে উল্লেখ করেন।

এছাড়া দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন-এমন সব শক্তি ও ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এখনই কারও নাম প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। সরকার পরিবর্তন হলে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পরিবর্তনও একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কারা থাকবে বা থাকবে না সেটিও যথাসময়ে স্পষ্ট হবে।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো আবেগের বিষয় নয়। পূর্ববর্তী সরকারের দোসররা এখনো দেশের ভেতরে ও বাইরে বসে সরকারের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করার জন্য মুখিয়ে আছে। তাই প্রশাসনে সংস্কার ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের অপসারণ অত্যন্ত জরুরি।

সূত্র জানায়, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সরকার অত্যন্ত ধীরস্থির এবং সতর্ক কৌশল অবলম্বন করছে। বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, রাষ্ট্রপতির মতো শীর্ষ সাংবিধানিক পদে নির্বাচনে অতীতে ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর ছিল না। তাই ন্যূনতম ঝুঁকি রয়েছে এমন কাউকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করা হবে না। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করা হয়েছিল। কিন্তু পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতভেদের কারণে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়, যা রাজনৈতিকভাবে বিএনপির জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল। বি. চৌধুরীর পর অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে রাষ্ট্রপতি করার ফলাফলও বিএনপির অনুকূলে যায়নি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন ও পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটে তার বিচক্ষণতার অভাবে বিএনপিকে কঠিন সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছিল। তাই অতীত অভিজ্ঞতা এবং অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কোনো প্রকার ‘ঝুঁকি’ নেবেন না। নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, সরকার একজন বিচক্ষণ, অভিজ্ঞ এবং দলের নীতি ও দর্শনে শতভাগ বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিকে এই পদে নিয়ে আসবে।

সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা জানিয়ে কর্মীদের বার্তা দেওয়ার ঘটনাকে সরকার নিছক রাজনৈতিক ‘স্টান্টবাজি’ হিসাবে দেখছে না। সরকার এই বক্তব্যের তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করছে। সামনে ৫ আগস্ট তথা জুলাই অভ্যুত্থানের দিনক্ষণ রয়েছে। এছাড়া ১৫ আগস্ট রয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী। এই দুটি দিনক্ষণকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ পরিস্থিতি ‘ঘোলাটে’ করার চেষ্টা করে কিনা সরকারসংশ্লিষ্টরা তাও খতিয়ে দেখছে।

এছাড়া রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টা পরেই অত্যন্ত স্পর্শকাতর জায়গা মেট্রো স্টেশনের নিচ থেকে বোমা উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্যে কাদের যোগসূত্র রয়েছে তা খতিয়ে দেখছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সঙ্গে কারা যোগাযোগ রক্ষা করছে, এসব ঘটনার নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ডদের খুঁজে বের করতে মাঠে নেমেছে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

সরকারের প্রভাবশালী একজন সদস্যে মতে, সবকিছুই সরকারের পর্যবেক্ষণ ও নজরদারিতে আছে। কারা সরকারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, আর কারা অনুগত থেকে দেশের জন্য কাজ করবে, তা নির্ধারণে কোনো তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে।

রাজনৈতিক বিশেষকরা মনে করেন, গণ-অভ্যুত্থান ও নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ায় পুরোনো রেজিমের (সরকারের) অবশিষ্টাংশ ক্ষমতায় থাকাটা বাস্তবসম্মত বা মানানসই নয়। এটি নতুন ও পুরোনো-দুপক্ষের জন্যই অস্বস্তিকর। ফলে নতুন সরকার সব পদে নিজস্ব বা পছন্দের লোক বসাবে, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল সাংবাদিকদের বলেন, আমরা কোনো ধরনের প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, যারা রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে রাষ্ট্রের ক্ষতি করতে চায়, আমরা তাদের কোলে বসিয়ে রাখব। বিচার-বিশ্লেষণ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে যারা ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত হবেন, তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো ঠিক হবে না।

তিনি বলেন,যে কোনো মূল্যে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং কোনো প্রকার অপ্রীতিকর পরিস্থিতি রুখে দিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এখন কঠিন ও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। রাষ্ট্রপ্রধানের মতো অতি স্পর্শকাতর পদে যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচন এবং আগস্ট মাসকে কেন্দ্র করে যে কোনো সম্ভাব্য চক্রান্ত প্রতিহত করাই এখন দেশবাসীর বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন তিনি।