অবসরে গিয়ে পদোন্নতি পাওয়া মাইনুল হকের পদোন্নতি বাতিল
৯দিন আগে উপসচিব পদে থাকা মাইনুল হক ভূঁইয়াকে অবসরে পাঠিয়েছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ৯ দিন পর পদোন্নতি পেয়ে তিনি হলেন যুগ্ম সচিব। শুধু তিনি নন পদোন্নতি পেয়েছেন দুর্নীতি ও অসদাচরণের দায়ে অতীতে দন্ড পাওয়া কর্মকর্তারাও। গত বৃহস্পতিবার উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব হয়েছেন ১৭৯ জন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে তালিকায় ৫৩ নম্বরে আছেন মাইনুল হক। তবে গতকাল শনিবার রাতে জানা গেছে মাইনুল হক ভূঁইয়ার পদোন্নতি বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
গত ৩০ জুন জারি করা প্রজ্ঞাপনে মাইনুল হক ভূঁইয়াকে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে পাঠানো হয়। যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে বৃহস্পতিবার জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাঁর নাম থাকায় প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
পদোন্নতির তালিকায় থাকা দন্ড পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে আছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত উপসচিব মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। ডেমরার সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে অসদাচরণের অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। তাঁকে তিন বছরের জন্য বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের লঘুদন্ড দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল করলেও তাঁর দন্ড বহাল রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব মো. শাহীনুর ইসলামকে বালুমহাল কেলেঙ্কারিতে লঘুদন্ড দেওয়া হয়।
নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) থাকাকালে তিস্তা নদীর বালুমহালের ইজারাগ্রহীতার চেক ব্যাংকে জমা না দিয়েই অর্থ প্রাপ্তির ভুয়া চুক্তি করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে এক বছরের জন্য বেতন গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে অবনমিতকরণের দন্ড দেওয়া হয়েছিল। তিনিও পদোন্নতি পেয়েছেন।
স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের উপসচিব মুহাম্মদ মকবুল হোসেনকে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে দুর্নীতির দায়ে শাস্তি দেওয়া হয়। রংপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে কর্মরত থাকাকালে নির্মাণকাজে দুর্নীতি ও অসদাচরণের দায়ে তাঁকে দুই বছরের জন্য দুটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখার দন্ড দেওয়া হয়। পরে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল তাঁর এই দন্ড বাতিল করে। তিনিও আছেন পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে।
এদিকে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে অবহেলার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত ২৮ মে বরখাস্ত হওয়া উপসচিব ছাদেকুর রহমানও পদোন্নতি পেয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের তদন্ত চলছিল। তিনি এখনও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি (সংযুক্ত) হিসেবে আছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এবার বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের ২৫ ও ২৪ ব্যাচের এবং অতীতে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তবে ২৫ ব্যাচে মেধা তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দুই কর্মকর্তার পদোন্নতি হয়নি।
সূত্র জানায়, প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের শীর্ষ কমিটি সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)। এ কমিটি উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাইয়ের পর পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করে। এবার প্রায় আট মাস যাচাই-বাছাইয়ের পর উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়। এরপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয় সেই সারসংক্ষেপ।
প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে এই কমিটির সদস্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র ও অর্থ বিভাগের সচিব বা জ্যেষ্ঠ সচিব এবং মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি)। প্রতিটি বৈঠকের জন্য ভাতা পান কমিটির সদস্যরা। এই কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
সাবেক মন্ত্রীদের আস্থাভাজন : আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো: শহীদুজ্জামান সরকারের একান্ত সচিব (পিএস) ও ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা হোসেন আহমেদ যুগ্মসচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যানের দীর্ঘ ৬ বছরের একান্ত সচিব মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামানকেও পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। দন্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তালিকার ৩ নম্বর) : প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ডেমরার সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে অসদাচরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। তাকে ৩ বছরের জন্য বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের লঘুদন্ড দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি বরাবর আপিল করলেও তার দন্ড বহাল রাখা হয়েছিল।
বালুমহল কেলেঙ্কারি ও লঘুদন্ড (তালিকার ১১ নম্বর) : নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) থাকাকালে তিস্তা নদীর বালুমহলের ইজারা গ্রহীতার চেক ব্যাংকে জমা না দিয়েই অর্থ প্রাপ্তির ভুয়া চুক্তি করার অভিযোগে মো: শাহীনুর আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ১ বছরের জন্য বেতন গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে অবনমিতকরণের দন্ড দেয়া হয়। ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের দুর্নীতি (তালিকার ৩২ নম্বর) : রংপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে কর্মরত থাকাকালে নির্মাণকাজে দুর্নীতি ও অসদাচরণের দায়ে মুহাম্মদ মকবুল হোসেনকে ২ বছরের জন্য দু’টি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখার দন্ড দেয়া হয়। পরবর্তীতে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল তার এই দন্ড বাতিল করেন।
দন্ডপ্রাপ্তদের পাশাপাশি দুদকের অনুসন্ধান ও বিভাগীয় মামলার মুখোমুখি হয়ে পরবর্তীতে অব্যাহতি পাওয়া একাধিক কর্মকর্তাও পদোন্নতির তালিকায় স্থান পেয়েছেন : ডিজিটাল ঘুষের অভিযোগ (তালিকার ৭ নম্বর) : সাভারের সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে মো: শরিফুজ্জামানের বিরুদ্ধে স্টাফদের মাধ্যমে ডিজিটালে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। দুদক অনুসন্ধানে প্রমাণ না পাওয়ায় এটি নথিভুক্ত করে। নামজারি ও মিসকেসের অনিয়মের বিভাগীয় মামলা থেকেও তিনি অব্যাহতি পান।
ভুয়া মৃত্যু সনদ ও সরকারি জমি রেকর্ড (তালিকার ২৪ ও ২৯ নম্বর) : ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভুয়া মৃত্যু সনদ ইস্যুর অভিযোগে মুহাম্মদ আবদুর রউফ মিয়া এবং জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড করে দেয়ার অভিযোগে মো: আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে দুদক অনুসন্ধান চালায়। পরবর্তীতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অনুসন্ধান সমাপ্ত করা হয়।
অন্যান্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা : গোপালগঞ্জের সাবেক ইউএনও এস এম মুনীর উদ্দিন (তালিকার ২১ নম্বর), বিভিন্ন জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত মো: মনিরুজ্জামান (তালিকার ৩৩ নম্বর), মোবাইল কোর্টের রায়ে অনিয়মের অভিযোগে তদন্তাধীন থাকা তাড়াইল উপজেলার সাবেক ইউএনও সাজিয়া জামান (তালিকার ৩৪ নম্বর) এবং বাণিজ্য-প্রতারণার অভিযোগ ওঠা সাইফুল ইসলামকে (তালিকার ৪০ নম্বর) পদোন্নতি দেয়া হয়েছে।
তালিকার ৪৩ নম্বরে থাকা এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলা নির্বাহী অফিসার থাকাকালে ক তফসিলভূক্ত সম্পত্তি বিধি বহির্ভূতভাবে নামজারি করলে তার বিরুদ্ধে র্দুর্নীতি ও অসদাচরণের বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলা তদন্ত শেষে তার দুইটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি পরবর্তী দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখার লঘুদন্ড দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি বরাবর আপিল করলে একটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি পরবর্তী এক বছরের জন্য স্থগিত রাখার দন্ড প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে প্রশাসনিক ট্রাইবুনাল তার দণ্ড বাতিল করেন।